হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক ব্যবহার নাজায়েজ

0

মায়ের বুকের দুধ সংরক্ষণের জন্য গত ১ ডিসেম্বর থেকে দেশে প্রথম বারের মতো চালু হয়েছে ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক’। বেনামি এনজিও সংস্থার অর্থায়নে এই মিল্ক ব্যাংকটি স্থাপন করেছে রাজধানীর মাতুয়াইলে অবস্থিত শিশু-মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, যে মায়েদের সন্তান জন্মের পর মারা গেছে বা নিজের সন্তানকে খাওয়ানোর পরও যে মায়েদের বুকে অতিরিক্ত দুধ থাকে, সেইসব মায়েরা হিউম্যান মিল্ক ব্যাংকে দুধ সংরক্ষণ করে রাখতে পারবেন। আর যে নবজাতকের জন্মের পরই মা মারা গেছেন, বা যাদের মা অসুস্থতার জন্য দুধ খাওয়াতে পারছেন না, সেই নবজাতকেরা এই দুধ খেতে পারবে।

কিন্তু দেশের ওলামায়ে কেরাম বলছেন, এই উদ্যোগ নবজাতক অনেক শিশুর জন্য আপাতদৃষ্টিতে উপকারী মনে হলেও মুসলিম সমাজের আত্মীয়তার বন্ধনে মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করবে। কারণ হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক থেকে দুগ্ধ পানকারী শিশুরা কোন মায়ের দুধ পান করছে, তা অজানা থাকবে। যেহেতু মিল্ক ব্যাংকে একসাথে অনেক মায়ের দুধ একত্রিত থাকবে, তাই কার দুধ তাকে দেওয়া হচ্ছে, তা নির্ণয় করাও অসম্ভব হয়ে যাবে। ফলে তার অজানা অসংখ্য দুধ ভাই-বোনের সৃষ্টি হবে; ইসলামি শরিয়াহ মুতাবেক যাদের সঙ্গে তার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া কঠোরভাবে হারাম। ফলে তার বিবাহের সময় এই আশঙ্কা পূর্ণ মাত্রায় থেকে যাবে যে, যাকে সে বিয়ে করছে, সে তার দুধ ভাই-বোন কি না।

দেশের শীর্ষস্থানীয় মুফতী মাওলানা মীযানুর রহমান সাঈদ বলেন, এটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগ। এই উদ্যোগের কারণে দেশের অসংখ্য মুসলিম ভবিষ্যতে হারাম সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়ার সমূহ আশংকা বিদ্যমান। প্রক্রিয়াটা বাংলাদেশে নতুন হলেও বহির্বিশ্বে বেশ পুরানো ইস্যু। আজ থেকে ১০-১২ বছর আগেই বিশ্বের মুহাক্কিক সকল আলেমই হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক ব্যবহার ও প্রতিষ্ঠাকে নাজায়েজ ঘোষণা করেছেন। সৌদি আরবের জেদ্দায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক একটি ফিকহি সেমিনারে নানা পর্যালোচনার পর এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সেমিনারে আল্লামা তকি উসমানি ও আল্লামা ইউসুফ আল-কারজাভিসহ বিশ্বের খ্যাতিমান ফিকহ-বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।

মুফতী মীযানুর রহমান সাঈদ আরও বলেন, শীর্ষস্থানীয় ফকিহদের এই ফতোয়ার পর এটা জায়েজ করা যায় কি না সে ব্যাপারে কেউ কেউ আবারও কথা তুলেছিলেন। কারণ, হানাফি মাজহাবের অন্যতম ফকিহ ইমাম কারখি রহমতুল্লাহ আলায়হি’র এক উক্তি মতে, শরিয়তে ‘হুরমতে রেজাআত’ (দুধ সম্পর্কীয় আত্মীয়তা) সাব্যস্ত হবার জন্য শর্ত হলো শিশুকে সরাসরি মায়ের স্তন থেকে দুধ পান করতে হবে। মায়ের স্তন থেকে দুধ বের করে আলাদাভাবে পান করালে এর দ্বারা হুরমতে রেজাআত সাব্যস্ত হবে না। আর মিল্ক ব্যাংকে দুধ পান করানো হয় আলাদাভাবে, সরাসরি মায়ের স্তন থেকে না। এই আপত্তি আসার পর বিশ্ববরেণ্য ফকিহরা এই উক্তির ওপর আবার গবেষণায় বসেন। অনেক গবেষণা ও পর্যালোচনার পর তাঁরা জানান, ইমাম কারখির এ মত অত্যন্ত দুর্বল সূত্রে বর্ণিত, দলিল হিসেবে তা গ্রহণ করার মতো না। এরপর পুনরায় আবার সকল ফকিহ এই ব্যাপারে ঐক্যমতে পৌঁছান যে, মিল্ক ব্যাংক প্রতিষ্ঠা এবং ব্যবহার নাজায়েজ।

এদিকে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে ওআইসির ইসলামি বিধান বিষয়ক বিশেষ বোর্ড ‘মাজমাউল ফিকহিল ইসলামী’ (International Islamic Jurist Of OIC)-ও হিউম্যান মিল্ক ব্যাংককে হারাম ঘোষণা করেছে। আন্তর্জাতিক এই ফিকহ বোর্ড মিল্ক ব্যাংকে দুধ দান করা, মিল্ক ব্যাংক থেকে দুধ পান করানো এবং মিল্ক ব্যাংক স্থাপন—সবগুলোকেই নাজায়েজ ফতোয়া দিয়েছে।

মুফতী মিজানুর রহমান সাঈদ বলেন, আমাদের দেশে এ যাবত কালে এটা ছিল না। সম্প্রতি পত্রপত্রিকার বরাতে মিল্ক ব্যাংক স্থাপনের কথা শুনে রীতিমতো উদ্বিগ্ন আমি। বাংলাদেশের মতো একটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশে এই উদ্যোগ ব্যাপকতা লাভ করলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। অসংখ্য হারাম বিয়ে অনুষ্ঠিত হবে সকলের অজান্তেই। যা সামাজিক বিপর্যয় ডেকে আনার পাশাপাশি ইসলামি পরিবারপ্রথাকেও হুমকির মুখে ফেলবে। তাই এই বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে। সাধারণ মানুষকে জানিয়ে দিতে হবে মিল্ক ব্যাংক ব্যবহার এবং প্রতিষ্ঠা উভয়টিই উলামায়ে কেরামের ঐক্যমতে নাজায়েজ।

একই কথা বলছেন চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন। তিনি বলেন, হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক স্থাপনের সূচনা হয়েছে মাত্র আমাদের দেশে। এটা পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়লে ইসলামের পরিবার প্রথা নিদারুণ হুমকির মুখে পড়বে। তাই দেশের মুফতীয়ানে কেরামের প্রতি আমার আহ্বান থাকবে, তাঁরা যেন জাতীয়ভাবে প্রেস কনফারেন্স অথবা বিশেষ সেমিনারের আয়োজন করে এ বিষয়ে সাধারণ মানুষকে খুব শিগগির সতর্ক করে দেন।

তিনি বলেন, আমার বিশ্বাস, ওলামায়ে কেরামের পক্ষ থেকে জোরালোভাবে সতর্ক করা হলে দেশের সাধারণ মানুষ হিউম্যান মিল্ক ব্যাংকের ব্যবহার থেকে দূরে থাকবে। এই প্রথা যে বা যারাই চালু করুক, জনগণ বয়কট করলে বেশি দূর আগাতে পারবে না।

Leave A Reply

Scroll Up