ফিরকায়ে গায়রে মুকাল্লিদের উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ

0

গায়রে মুকাল্লিদ বলতে বোঝায় যারা তাকলীদ বা আইম্মায়ে মুজতাহিদীনের অনুস্মরণ করার গুরুত্ব অস্বীকার করেন। তারা দাবী করেন সকলকে সরাসরি কুরআন-হাদীস থেকেই মাসআলা মাসায়েল চয়ন করে আমল করতে হবে। কোন ইমামের তাকলীদ বা অনুস্মরণ করা যাবে না। এরা নিজেদের আহলে হাদীস বলেও পরিচয় দেয়।

১২৪৬ হিজরীর পূর্বে ভারতবর্ষে গায়রে মুকাল্লিদ তথা আহলে হাদীস সম্প্রদায়ের কোন অস্তিত্বই ছিলনা। যা তাদের প্রসিদ্ধ আলেম নবাব সিদ্দীক হাসান খান রচিত তারজুমানে ওহহাবিয়্যাহর বক্তব্যই প্রমাণ বহন করে। তিনি এতে লেখেন, “হিন্দুস্তানের মুসলমানদের অবস্থা হল, এদেশে ইসলামের সুচনা লগ্ন থেকেই অধিকাংশ মানুষ রাজা বাদশাহদের রীতি ও মাযহাবী ধারাকে পছন্দ করে। ঐ সময় থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত সবাই হানাফী মাজহাবের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং এখনো রয়েছে। আলিম, ফাজিল, কাজী, মুফতী ও বিচারক এ সকল সুমহান দায়িত্ববান ব্যক্তিবর্গ এ মাজহাব থেকেই এসেছে।” (পৃ: ১৫)

ফেরকায়ে গায়রে মুকাল্লিদের সুচনা সম্পর্কে মাওলানা কুতুবুদ্দীন রহ. (বিখ্যাত গ্রন্থ ‘মাজাহেরে হক্ব’এর প্রণেতা) তার তুহফাতুল আরব ওয়াল আজম গ্রন্থে লিখেন, যার বিষয় বস্তু এমন, ১২৪৬ হিজরীর পর হিন্দুস্তানে গায়রে মুকাল্লিদ ফিরকার আত্মপ্রকাশ ঘটে। এর অগ্রণী ছিলেন মৌলভী আব্দুল হক বেনারসী। তাকেই গায়রে মুকাল্লিদী মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা বলে গণ্য করা হয়। সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ র. তার এই তাকলীদ বিরোধী ভূমিকা বনাম ফ্যাসাদের পথ গ্রহণের কারণে তাকে দল থেকে বহিস্কার করে দেন। তিনি আইম্মায়ে দ্বীনের তাকলীদ করার প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করেন। তিনি ফোকাহায়ে কেরামের বিরুদ্ধে বিশেষত: হযরত ইমাম আবু হানীফা র. এর বিরুদ্ধে জনমনে বিদ্বেষের বীজ বপন করেন। এ সকল হীন কাজের পাশাপাশি নিজেকে সাইয়্যেদ শহীদ রহ. এর খলীফা বলে দাবী করেন। তখন ভারতবর্ষের ধর্মপ্রাণ জনগন বিশেষ করে সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ র. এর খলীফা ও মুরিদগণ এ মর্মে হারামাইনের উলামায়ে কেরামের কাছে ফতওয়া চান, সেখানকার চার মাযহাবের মুফতিগণ এবং আবেদ সিন্ধী র. এর মত অন্যান্য উলামায়ে কেরাম এরূপ লোকদের গোমরাহ ও বিভ্রান্তকারী আখ্যা দিয়ে ফতোয়া প্রদান করেন এবং তাতে প্রত্যেকেই আপন আপন সীল মোহর অংকিত করেন। (আন নাজাতুল কামীলাহ- ২১৪)

পরবর্তীতে ১২৫৪ হিজরীতে শাহ ইসহাক দেহলভীর নিকট এ মর্মে আবার ফাতওয়া তলব করা হলে। তিনিও তার জবাবে নির্দিষ্ট ইমামের তাকলীদকে ওয়াজিব এবং তা অস্বীকারকারীকে গোমরাহ আখ্যায়িত করেন। দেশের অন্যান্য বহু উলামা তাতে স্বাক্ষর করেন। অতপর হারামাইনের উলামা কর্তৃক প্রদত্ত ফতওয়ার সাথে এই ফতওয়াকে একত্রিত করে تنبيه الضالين (তাম্বীহুদ দলীন) নামে প্রকাশ করা হয়।

গায়রে মুকাল্লিদী মতবাদ সৃষ্টির পশ্চাতে সাইয়্যেদ আহমেদ শহীদ র এর বিরোধিতা পূর্বক এবং মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক বিরোধ সৃষ্টি পূর্বক ইংরেজদের মনতুষ্টি সাধন একটা বড় কারণ ছিল বলে ঐতিহাসিক ভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এ ব্যপারে প্রসিদ্ধগায়রে মুকাল্লিদ মুহাম্মাদ মুবারক বলেন,
“জামাআতে গুরাবয়ে আহলে হাদীস (আহলে হাদীসের একটি শাখা) এর বুনিয়াদ রাখা হয়েছিল মুহাদ্দিছিনে কেরামের বিরোধিতার উপর শুধু এতটুকুই উদ্দেশ্য নয়। মুজাহিদ আন্দোলন অর্থাৎ সাইয়্যেদ আহমদ শহীদের আন্দোলনের বিরোধিতা কওে ইংরেজদের সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যও প্রচ্ছন্ন ছিল।

গায়রে মুকাল্লিদগণের মুরব্বী নওয়াব সিদ্দীক হাসান সাহেবের স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য হল, “ধর্ম থেকে এই স্বাধীনতা বনাম আমাদের নতুন ধর্ম ইংরেজ শাসনের উদ্দেশ্যের সমাথবোধক।
তিনি আরো বলেন, ভূপালের শাসকও সর্বদা ধর্মীয় স্বাধীনতা (তাকলীদ না করা ) এর ব্যপারে স্বচেষ্ট ছিলেন। যা ইন্ডিয়ান গভর্নমেন্টের খাস উদ্দেশ্য ছিল।
আহলে হাদীসের ওকীল হুসাইন বাটালভীর ভাষ্য হলো, “প্রজাহিতৈষী বৃটিশ সরকার যে এই আহলে হাদীস দলের শুভাকাংখী তার একটা বড় এবং জাজ্জ্বল্যমান প্রমাণ হল এরা বৃটিশ গভর্নমেন্টের ছায়াতলে থাকাকে ইসলামী শাসনের ছায়াতলে থাকার চেয়েও ভাল মনে করে।
মওলভী হুসাইন বাটালভী ইংরেজদের বিরদ্ধে জিহাদ না করার মর্মে যে কিতাব লিখেছিলেন, সে জন্য ইংরেজদের পক্ষ থেকে তাকে জায়গীর প্রদান করা হযেছিল। (হিন্দুস্তান কি পহলী ইসলামী তাহরীক)

মাজহাব বিরেধীদের নামের বাহার

গায়রে মুকাল্লিদদের প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্ব নওয়াব সিদ্দীক হাসান খানের যুগ পর্যন্ত গায়রে মুকাল্লিদগণ নিজেদের মুওয়াহহিদীন বলে পরিচয় দিতেন। কখনো তারা নিজেদের মুহাম্মাদী বলে পরিচয় দিতেন। এই পরিচয় গ্রহণের পশ্চাতে একটি কারণ এও ছিল যে, বিরুদ্ধবাদীরা তাদেরকে ওয়াহাবী বলে পরিচয় দিত। ১৮১৮ সনে সর্বপ্রথম তারা নিজেদেরকে আহলে হাদীস নামে পরিচয় প্রদান করেন। এ প্রসঙ্গে আহলে হাদীসের একবারে ঘরেরমানুষ মৌলভী আসলাম জিরাজপুরী লিখেন, “প্রথমদিকে এই দল নিজেদের জন্য কোন বিশেষ নাম নির্ধারণ করেননি। মাওলানা সায়্যিদ আহমদ শহীদ র. এর তীরোধানের পর যখন বিরুদ্ধবাদীরা দুর্ণাম করার জন্য তাদেরকে ওহাবী বরতে শুরু করে তখন তারা নিজেদেরকে মুহাম্মাদী পরিচয় দিতে থাকে। এরপর এই নাম পরিহার করে আহলে হাদীস খেতাব নির্বাচন করে। যা আজ পর্যন্ত বলবৎ রয়েছে। (নাওযাদেরাত- ৩৪২, তায়েফায়ে মানসূরাহ- ১০১)

কিন্তু এরপরও অনেকে তাদেরকে ওহাবী বলে আখ্যায়িত করা অব্যাহত রাখায় সরকারীভাবে তারা আহলে হাদীস নামটিকে নিজেদের জন্য রেজিষ্ট্রেশন করে নেন। ১৮৮৬ সনে এশাআতুস সুন্নাহ পত্রিকার সম্পাদক প্রসিদ্ধ গায়রে মুকাল্লিদ ব্যক্তিত্ব আবু সাঈদ মুহাম্মদ লাহরী তৎকালীন ইংরেজ গভর্নমেন্টের কাছে তার পত্রিকার মাধমে এই মর্মে আবেদন করেন যে, ওহাবী শব্দটি আহলে হাদীস নামে খ্যাত দলটির ব্যপারে যারা সর্বদা ইংরেজ সরকারের নেমক হালাল এবং কল্যাণকামী। আর এ বিষয়টা সুপ্রমাণিত এবং সরকারী কাগজ পত্রেও স্বীকৃত-সংগত নয়। সে মর্মে এই দলের লোকজন অত্যান্ত আদব ও বিনয়ের সাথে গভর্নমেন্টের নিকট আবেদন করছে যে, সরকারীভাবে তাদের জন্য ওহাবী শব্দটি বর্জন পূর্বক তাদের জন্য আহলে হাদীস শব্দটি ব্যবহার করা হোক। এই বিষয়টা আবেদন আকারে হুসাইন বাটালভী পাঞ্জাব গভর্নমেন্টের নিকট পেশ করেন তখনকার পাঞ্জাবের গভর্নর সে আবেদন মঞ্জুর করে তাকে জানান যে, আপনাদের জন্য এই নামের এ্যালটমেন্ট দেয়া হল। (রদ্দে গায়রে মুকাল্লিদিয়্যাত)

এ সকল আলোচনার দ্বারা এ কথা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে, আহলে হাদীস সম্প্রদায় একটি নব উদ্ভাবিত ফেতনা যা মুসলমানদের ভ্রাতৃত্ত ও ঐক্যকে নষ্ট করতে ইংরেজদের পৃষ্টপোষকতায় মদদপুষ্ট হয়েছে। যাদের লক্ষ্য ইসলামের কল্যাণ করা নয় বরং ক্ষতিকরা, এই সম্প্রদায় বর্তমানে আরবের শায়েখদের থেকে টাকা খাবার উদ্দেশ্যে নিজেদের নাম সালাফি বলে প্রচার করে। নিজেদেও পেট পুজার জন্য তারা যে কোন খোলস ধারণ করতে দ্বীধাবোধ করে না। এই গিটগিটির মত বহুরূপী দল থেকে আল্লাহ আমাদের ইমান ও আমলকে হেফাজত করুন। আমীন।

(সূত্রঃ মাযহাব বিরোধীদের স্বরূপসন্ধানে)

Share.

About Author

দীন প্রচারে নিজে উৎসাহিত করি মানব সমাজকে।

Leave A Reply