জোরে জ‌িকির না আস্তে জিকর- কোনটা জায়েয?

0

জিজ্ঞাসাঃ কেউ কেউ বলে যে, জিকির জোরে করা জায়েয নেই। আবার কেউ কেউ ব‌লে জো‌রে জি‌কির জা‌য়েয। পদ্ধতিতে যিকর করা উত্তম—উচ্চস্বরে না নীচুস্বরে? কুরআন, হাদীস ও ফিক্বহের দলীলসহ জানতে চাই।

সমাধানঃ শাইখুল মুফতি তাকী উসমানী দা. বা. -কে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে উত্তরে তিনি লিখেছেন–

‘আলোচ্য বিষয়ে মুহাক্কিক আলেমদের দৃষ্টিভঙ্গি এই যে, উভয় পদ্ধতির জিকির জায়েয। তবে পরিবেশ ও স্থানভেদে ফজিলতে ভিন্নতা আছে। অনেক পরিবেশে উচ্চস্বরে জিকির করা উত্তম এবং অনেক পরিবেশে নীচুস্বরে জিকির করা উত্তম। সুতরাং যদি কোনো হক্কানী পীর মুরিদের অবস্থা নির্ণয় করে তাকে উচ্চস্বরে জিকির করার অযীফা দেন, তাহলে তার জন্য উচ্চস্বরে জিকির করা জায়েয। তবে এক্ষেত্রে দুটি শর্ত আছে।
এক. উচ্চস্বরে জিকির করার কারণে যেন কারো ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটে কিংবা এটি যেন কারো যৌক্তিক কষ্টের ‘কারণ’ না হয়।
দুই. উচ্চস্বরে জিকির মৌলিক ইবাদত মনে করা যাবে না; বরং এটাকে চিকিৎসা হিসাবে গ্রহণ করতে হবে।-ফাতাওয়া উসমানি ১/২৬০

আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّن مَّنَعَ مَسَاجِدَ اللّهِ أَن يُذْكَرَ فِيهَا اسْمُهُ

‘যে ব্যক্তি আল্লাহর মসজিদসমূহে আল্লাহর নামের জিকির করা থেকে বাধা দেয়, সে বড় জালিম।’-সূরা বাকারা ১১৪

বলা বাহুল্য, জিকির থেকে বাধা প্রদান করা তো তখনই সম্ভব হবে যখন জিকির সম্পর্কে অবহিত হবে।

এছাড়া সহীহ মুসলিমে আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রাযি. থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ নামাযের পর উচ্চস্বরে পড়তেন–

لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

‘আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, তিনি এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর কোন অংশীদার নেই। সকল ক্ষমতা এবং প্রশংসা তাঁরই জন্য। তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতা রাখেন।’ (মুসলিম ১/১২১৮)

অতএব, নামায, কুরআন তিলাওয়াত বা কারো ঘুমের ক্ষতি না হলে জিকির জোরে করা জায়েয। বরং ক্ষেত্র বিশেষে অধিক ফলপ্রসু। মনের গোনাহের আস্তরণ তোলার জন্য জিকির জোরে করলেই প্রভাব বেশি হয়। আস্তে নয়। আর জোরে জিকির করা সবক দেয়া হয় মনের রোগের চিকিৎসা হিসেবেই। জোরে জিকিরকে আবশ্যকীয় মনে করাটা যেমন বিদআত। তেমনি কারণ ছাড়া অহেতুক এটাকে বেদআত বলাটাও নিষিদ্ধ। তবে সর্বাবস্থায়ই জিকির আস্তে করাই উত্তম।

হাদীসে এসেছে-

عن أبي سعيد الخدري عن رسول الله صلى الله عليه و سلم قال : أكثروا ذكر الله عز و جل حتى يقال إنه مجنون(مسند عبد بن حميد، من مسند أبي سعيد الخدري، رقم الحديث-925)

অনুবাদ-হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন-তোমরা অধিক পরিমাণ আল্লাহর জিকির কর যেন লোকেরা তোমাদের পাগল বলে। -মুসনাদে আব্দ বিন হুমাইদ, হাদীস নং-৯২৫, সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-৮১৭, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১১৬৫৩, শুয়াবুল ঈমান, হাদীস নং-৫২৩

এ হাদীসে লক্ষ্য করুন-জিকির এমনভাবে করতে বলা হয়েছে যে, লোকেরা যেন পাগল বলতে শুরু করে দেয়, আর কোন ব্যক্তি যদি মনে মনে জিকির করে তাহলে কোন ব্যক্তি তাকে কোনদিন পাগল বলবে? মনের খবর কে রাখে? তাহলে পাগল বলবে কিভাবে? পাগল বলবে তাকেই যে জোরে জোরে পাগলের মত সর্বদা জিকির করতেই থাকে। এ হাদীস দ্বারা একথাই স্পষ্ট প্রমাণ করছে যে, জিকির জোরে করতে হবে ক্ষেত্র বিশেষে। সব সময় চুপ চাপ নয়।

وأجمع العلماء سلفا وخلفا على استحباب ذكر الله تعالى جماعة في المساجد وغيرها من غير نكير إلا أن يشوشجهرهم بالذكر على نائم أو مصل أو قارىء قرآن كما هو مقرر في كتب الفقه (حاشية الطحطاوى على مراقى الفلاح، باب الإمامة، فصل في صفة الأذكار-185)

وكذا فى رد المحتار- كتاب الحظر والإباحة، فصل فى البيع-9/570

অনুরূপভাবে আরো কিছু বর্ণনা থেকে উচ্চস্বরে জিকির করার প্রমাণ পাওয়া যায়। বিস্তারিত প্রমাণাদি হযরত থানবী রহ. ইমদাদুল ফাতাওয়াতে কিতাবুস সুলূক-এর অধীনে লিপিবদ্ধ করেছেন।

والله اعلم بالصواب

Share.

Leave A Reply