সুযোগ ও মাছি

0

আবিদা


জীবন গড়ার সুযোগ বারবার আসে না এবং তা কারো জন্য চিরকাল অপেক্ষা করে না। তাই যারা সময়মতো সুযোগকে কাজে লাগায় জীবনে তারাই সফল হয়। অতএব আপনি যদি আপনার সন্তানের জীবনে সাফল্য দেখতে চান তাহলে তাকে এমনভাবে গড়ে তুলুন যে, সে তার সুযোগ ও সম্ভাবনাগুলো অনুধাবন করতে পারে এবং সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে।

মশা ও মাছির বিষয়ে নানাজী অত্যন্ত সংবেদনশীল ছিলেন। কামরায় একটি মাছিও কোথাও থাকলে তিনি অস্বস্তি বোধ করতেন। তাই নিয়মিত কামরায় স্প্রে করতেন, এরপর দীর্ঘ সময় কামরা বন্ধ থাকত। ভেতরে অবস্থানের সময়ও দরজা বন্ধ রাখতেন।

তাঁর কামরায় প্রবেশের সময় বা কামরা থেকে বের হওয়ার সময় দরজা পুরো খোলার অনুমতি ছিল না। যতটুকু খুললে ঢোকা যায় বা বের হওয়া যায় ঠিক ততটুকু খোলার অনুমতি ছিল। এরপর তা বন্ধ করে দেওয়া হত।

একদিনের কথা আমার এখনো মনে আছে। আমি তাঁর কাছে গিয়েছি। কোথা থেকে একটি মাছি এসে জানালার কাঁচে  বসল। নানাজী দ্রুত তা মেরে ফেলতে বললেন। বলাবাহুল্য, নানাজীর মতো সতর্কতা আমার মধ্যে ছিল না। তাই আমার বেশ বিলম্ব হল। কী দিয়ে মাছিটি মারা যায় তা খুঁজে নিয়ে যখন জানালার কাছে পৌঁছলাম, ততক্ষণে তা উড়ে গেছে। আমি এদিক সেদিক খুঁজতে লাগলাম, কিন্তু বইপত্রে ঠাসা কামরাটির কোথাও তাকে খুঁজে পেলাম না।

নানাজী আমার আলস্য ও ধীরতা লক্ষ করে বিরক্ত হলেন এবং একটি অসামান্য কথা বললেন। তিনি বলেছিলেন, ‘নানু, একটি কথা খুব ভালোভাবে মনে রেখো। তা এই যে, জীবনের সুযোগ ও সম্ভাবনাগুলো এক একটি মাছি। তোমার অবহেলা ও অলসতার সুযোগে তারা যদি পালিয়ে যায় তাহলে পুনরায় তুমি তাদেরকে নাও পেতে পার।

‘সুযোগ ও সম্ভাবনা কারো জন্য অপেক্ষা করে না। হয় তাকে সময়মতো কাজে লাগাবে অথবা তা তোমার হাতছাড়া হয়ে যাবে। এরপর তোমার জীবনে এই সুযোগ দ্বিতীয়বার নাও আসতে পারে কিংবা এলেও যা প্রথমে সহজেই  এসেছিল  তার জন্য এখন অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে।’

* * *

তাঁর নির্দেশনা অত্যন্ত স্পষ্ট : যে ব্যক্তি সময়মতো সুযোগকে কাজে লাগায় না, সে যদি পরে অনুতপ্তও হয় তবুও তা কাজে আসে না।

তবে এর অর্থ এই নয় যে, আমরা কাজকর্মে তাড়াহুড়ো করব; বরং যেসব ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তগ্রহণের জন্য দীর্ঘ চিন্তাভাবনার প্রয়োজন নেই সেখানে আমাদের প্রতিক্রিয়া দ্রুত ও সাবলীল হওয়া চাই। আলস্য ও উদাসীনতার শিকার হওয়া উচিত নয়।

দুই দশক পরও তাঁর এই কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে। আমি প্রায়ই আত্মীয় স্বজন ও পরিচিতদের নিকট তা আলোচনা করি। আর যখনই দ্বিধা-সংশয় কিংবা অলসতা ও উদাসীনতার কারণে একটি সুন্দর সুযোগ বিনষ্ট হতে দেখি কিংবা কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে দেখি তখনই এই কথাটা নতুন করে স্মৃতিতে জেগে ওঠে।

এমন বহু দৃষ্টান্ত আমি দেখেছি যে, সময়মতো ব্যবস্থা না নেওয়ায় তা সমস্যার আকার ধারণ করেছে। ছোট খাট দৃষ্টান্তও যেমন আছে তেমনি আছে গুরুতর দৃষ্টান্ত। ধরুন, ঘরের মেঝেতে কাঁচের একটি টুকরা পড়ে আছে, কিন্তু তা সরিয়ে ফেলতে বিলম্ব করার কারণে একজন শিশুর পায়ে তা ফুটে গেল। এখন হতে পারে তার পায়ে অপারেশনেরও প্রয়োজন দেখা দিবে।

পক্ষান্তরে গুরুতর দৃষ্টান্ত যেমন শিশুদের ছোট ছোট ত্রুটি, তার অহংবোধ, অন্যকে কষ্ট দেওয়ার প্রবণতা শৈশবেই সংশোধন করা উচিত। কিন্তু অনেক পরিবারে এই ভেবে ভ্রূক্ষেপ করা হয় না যে, ছোটরা এমন করেই থাকে। কিন্তু সেই শিশুটি যখন বড় হয় তখন তার মন্দ স্বভাবও শক্তিশালী হয়ে যায়। তখন তা সংশোধন করা আর সহজ থাকে না।

Share.

Leave A Reply