বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০১৯, ০৮:০৭ পূর্বাহ্ন

সর্বশেষ :
যে কারণে প্রতিদিন কুরআন মাজীদ পড়া উচিত আল্লাহ তাআলা বলা হারাম! যে দিন সহবাস নিষেধ! কুকুর দ্বারা কি শিকার করানো যায়? খতনা উপলক্ষে অনুষ্ঠান করা কি বৈধ? ওযুর পর বাচ্চাকে দুধ পান করানো কি নিষেধ? Veet বা ম‌েডিসিন দ্বারা গোপন লোম পরিষ্কার করা প্রসঙ্গে ন্যায়ের বিষয়ে আপোষহীনতা সৎ খালাকে বিয়ে করা কি বৈধ? অসম্পূর্ণ বাচ্চা প্রশবের পর রক্তঃস্রাব বস্ত্রহীন অবস্থায় সহবাস বিয়েতে যে ৫টি কাজ করা যাবে না স্ত্রীর যৌনাঙ্গে বীর্যপাত না হলে কী গোসল ফরজ হয় না? শারিরিক সম্পর্কের পর বিয়ে সিক্স প্যাক বিতর্ক : দাম্ভিকতার ভয়াবহ প্রদর্শন বিড়ি সিগারেট খাওয়া শালীর সাথে শারিরিক সম্পর্কের কারণে স্ত্রী তালাক হয়ে যায়? পান ও জর্দা খাওয়া কেমন? স্ত্রীর মাসিক চলাকালীন সময় কনডম বা অন্যাপায়ে সহবাস শরীয়তে কুলখানী কি বৈধ?
সিক্স প্যাক বিতর্ক : দাম্ভিকতার ভয়াবহ প্রদর্শন

সিক্স প্যাক বিতর্ক : দাম্ভিকতার ভয়াবহ প্রদর্শন

জনৈক বক্তা এক ওয়াজে বলেছেন, বিশ্বনবী সা. সিক্স প্যাক ছিলেন।  অতঃপর শুরু হয় এ নিয়ে বিতর্ক।  বিতর্ক কতটা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে তা পক্ষে-বিপক্ষের লোকদের প্রতিবাদের ভাষা ও আক্রমণের ধরন থেকে সহজেই বোঝা যাচ্ছে।  বক্তার পক্ষের লোকেরা “বিশ্বনবী সিক্স প্যাক ছিলেন” এ কথার যথার্থতা প্রমাণে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।  নানা যুক্তি তুলে ধরছেন লেখালেখি ও ভিডিও বার্তায়।  আর যারা এ কথার সমালোচনা করেছেন তাদেরকে অজ্ঞ, বুঝে না, আধুনিক শব্দ, ডিজিটাল শব্দ, না বুঝে সমালোচনা করে ইত্যাদি ইত্যাদি বলে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করছেন।

অন্যদিকে বিপক্ষের লোকেরা তার এই বক্তৃতাকে কুফর পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছেন।  একজন অবশ্য ইতিমধ্যে বক্তাকে কাফের বলে ঘোষণা দিয়ে ফেলেছেন।

সুনির্দিষ্টভাবে কাউকে কাফের ঘোষণার ক্ষেত্রে কতটা সর্তকতা অবলম্বন করা লাগে কাফের ঘোষনাকারীর হয়তো একেবারেই তা জানা নেই।  তবে হ্যাঁ, এ বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর।  রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শানে অবমাননাকর কোন শব্দ ঈমান ধ্বংসের জন্যই যথেষ্ট।

আসলে এই বিতর্কে উভয়পক্ষের লোকেরাই দাম্ভিকতার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন।  নিজের মতকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে লঙ্ঘন করেছেন শরীয়তের সীমা।

এক ভিডিওতে দেখলাম, বক্তার উপস্থিতিতেই একজন সিক্স প্যাক এর ব্যাখ্যা করছেন।  দরকার কী? যে বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে সে বক্তৃতাতেই তো বক্তা নিজে সিক্স প্যাক-এর ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন যে, সিক্স প্যাক মানে পেটে ৬টা প্যাক (ভাঁজ)।
মোদ্দাকথা এই দাঁড়ালো যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সিক্সপ্যাক ছিলেন মানে তার পেটে ছয়টা প্যাক ছিল!
সিক্স প্যাক শব্দ দিয়ে রাসূলুল্লাহ ফিট ছিলেন, সুঠাম দেহের অধিকারী ছিলেন, বক্তার যদি এমন উদ্দেশ্য হয় তাহলে ‘সিক্স প্যাক এর মত ছিলেন’ এভাবে বললেন না কেন? প্রকৃতপক্ষে তো রাসুল সিক্স প্যাক-এর চেয়েও অনেক বেশী সুন্দর ছিলেন।  তিনি যেভাবে সিক্স প্যাক এর ব্যাখ্যা করলেন তাতে তো মনে হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহর পেটেও সিক্স প্যাক ছিল।  অথচ সিক্স প্যাক একটা কৃত্রিম জিনিস।  দেহের সৌন্দর্যের জন্য মানুষ জিমনেশিয়াম করে সিক্স প্যাক হয়।  আল্লাহ যাকে কুদরতীভাবে সুন্দর বানিয়েছেন তার জন্য তো সিক্স প্যাক এর প্রয়োজন নেই।

যারা তার পক্ষ নিয়ে সিক্স প্যাক-এর ব্যাখ্যা দিচ্ছেন তারা কতটা সচেতন কিংবা সাধারণ জ্ঞান সম্পন্ন এ নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ আছে।  তারা দলাদলি না করে বক্তাকে বলতে পারতেন যে, আপনি একটা ভিডিও বক্তব্যে আপনার বক্তৃতা স্পষ্ট করুন।  কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম সিক্স প্যাক তথা তার পেটে ছয়টা প্যাক ছিল একথা বক্তা কোনদিনই প্রমাণ করতে পারবে না।  হয়তো এ কথাটি তিনি এভাবে বলতেও চাননি।  হাদীসের কিতাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সৌন্দর্যের বর্ণনা যেভাবে এসেছে সেভাবেই দেয়া উচিত।  কোন কিছুর সঙ্গে তুলনা করতে গেলে এই তুলনা করা কতটা যৌক্তিক এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শানে কতটা মানায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।  আজ পর্যন্ত রসূলুল্লাহর সৌন্দর্যকে কেউ কোন মানুষের সঙ্গে তুলনা করতে পারেনি।  চাই সে অকৃত্রিম কিংবা কৃত্রিম উপায়ে যতই সুন্দর হোক না কেন।  রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সৃষ্টির সবচেয়ে সুন্দর ছিলেন।

তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সিক্স প্যাক ছিলেন সরাসরি এ ধরনের বক্তব্য সুন্নাহ বিরোধী।  এ ধরনের কথার কোন প্রমাণ শরীয়তের দলিল গুলোতে খুঁজে পাওয়া যাবে না।  তবে হ্যাঁ চাঁদ কিংবা সূর্যের সঙ্গে তুলনা করা হয় এটা একটা অনুভূত বিষয়।  মানুষের সাহস কিংবা হিম্মত কে বাঘ সিংহের সঙ্গে তুলনা করা হয় এটাও অনুভূত বিষয়।  তাই বলে যে কোন বিষয়কে যে কোন বিষয়ের সঙ্গে তুলনা করা যায় না।

রসুলুল্লাহ সিক্স প্যাক ছিলেন এতটুকু বলে থেমে যাওয়া তার জন্য ভুল ছিল।  রসূলুল্লাহর সৌন্দর্য বোঝাতে গিয়ে সিক্স প্যাক এর উদাহরণ দিতে হলে, উদাহরণের পরে বিষয়টি আরো খোলাসা করার দরকার ছিল।
তার বলার প্রয়োজন ছিল যে, সিক্স প্যাক মানে পেটে ৬ টি প্যাক হলেও রসূলুল্লাহর ব্যাপারে এ ধরনের কোনো বর্ণনা নেই।  তবে যারা সিক্স প্যাক করে দেহের সৌন্দর্য বাড়ায়, আমার রসূল তাদের চেয়েও হাজার গুণ বেশি সুন্দর ছিলেন।  আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে সহীহ বুঝ দান করুন।  আমীন!

রাসূল সা.- এর সুন্দর্য্য

বারা ইবনে আযেব রা. বলেন, ‘রাসুল সা. ছিলেন মাঝারি গড়নের। তার উভয় বাহুমূলের মধ্যবর্তীস্থান অন্যদের তুলনায় কিছুটা প্রশস্ত ছিল। তার মাথার কেশরাশি উভয় কানের লতি পর্যন্ত প্রলম্বিত ছিল। পরনের লাল পোশাকে তার চেয়ে অধিক সুন্দর আমি কাউকে দেখিনি’।

অন্য বর্ণনায় আছে- রাসুল সা. ছিলেন সবচে’ সুন্দর চেহারা ও গঠনের অধিকারী; অতি লম্বাও না, খাটোও না।

অন্য হাদিসে আছে- বাবরি চুল বিশিষ্ট লাল পোশাক পরিহিত কোনো লোককে রাসুল সা. এর চেয়ে অধিক সুদর্শন দেখিনি। তার চুল কাঁধ ছুঁয়ে যেত।

বারা রা.-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, রাসুল সা.-এর চেহারা কি তরবারির মতো ছিল? তিনি জবাব দিলেন, ‘না; বরং চাঁদের মতো’। [বুখারী, হাদিস ৩৫৪৯, ৩৫৫১, ৩৫৫২]

আনাস ইবনে মালেক রা. বলেন, ‘রাসুল সা. অতি লম্বা ছিলেন না, আবার খাটোও না। তিনি ধবধবে সাদা ছিলেন না, আবার সম্পূর্ণ তামাটে বর্ণেরও না। কুঞ্চিত চুল বিশিষ্ট ছিলেন না, আবার তার চুল একেবারে সোজাও ছিল না’।

অন্য বর্ণনায় আছে, তিনি ছিলেন মাংসল হাত-পা ও সুদর্শন চেহারার অধিকারী। আমি পূর্বে বা পরে কাউকে তার মতো দেখিনি। তার হাতের তালু ছিল প্রশস্ত।

আবু তুফাইল রা. বলেন, ‘রাসুল সা. ছিলেন ফর্সা লাবণ্যময় আকর্ষণীয়। অন্য বর্ণনায় আছে, তিনি ছিলেন ফর্সা ও লাবণ্যময় চেহারার অধিকারী’। [মুসলিম, হাদিস ২৩৪০]

জাবের ইবনে সামুরা বলেন, ‘রাসুল সা.-এর মুখবিবর ছিল কিছুটা প্রশস্ত, চোখ ছিলো টানা। পায়ের গোড়ালি ছিল হালকা গোশতবিশিষ্ট’। [মুসলিম, হাদিস ২৩৩৯]

তিনি আরও বলেন, রাসুল সা.-এর মাথার অগ্রভাগের কিছু চুল ও কিছু দাড়ি ধুসর বর্ণের হয়ে গিয়েছিল। তেল ব্যবহার করলে তা প্রকাশ পেত না। চুলগুলো এলোমেলো থাকলে বোঝা যেত। তিনি ছিলেন ঘন দাঁড়িবিশিষ্ট। কেউ বলল, তার চেহারা কি তলোয়ারের মতো ছিল? তিনি বললেন, না; বরং চাঁদ-সূর্যের মতো, গোলাকৃতির। তার স্কন্ধদেশে মোহরে নবুয়ত দেখেছি কবুতরের ডিমের মতো; তার শরীরের বর্ণেরই। [মুসলিম, হাদিস ২৩৪৪]

আনাস রা. বলেন, ‘রাসুল সা.-এর হাতের তালুর মতো কোমল রেশমও আমি স্পর্শ করি নি। এবং তার শরীরের ঘ্রাণের চেয়ে উত্তম কোনো ঘ্রাণ অনুভব করিনি। অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসুল সা. ছিলেন উজ্জ্বল বর্ণের। তার ঘাম মুক্তার মতো চকচক করত। হাঁটার সময় তিনি সামনের দিকে একটু ঝুঁকে হাঁটতেন’। [বুখারী, হাদিস ৩৫৬১]

জাবের ইবনে সামুরা রা. থেকে বর্ণিত, শৈশবে রাসুল সা. তার গালে হাত বুলিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি তার হাতে এমন শীতলতা ও সুগন্ধি অনুভব করেছি, যেন তিনি তা সুগন্ধির কস্তুরি থেকে বের করেছেন’। [মুসলিম, হাদিস ২৩২৯]

অবয়বের সৌন্দর্য : রাসুল সা.-এর দেহাবয়ব ও সৌন্দর্য বিবরণ-সম্বলিত হাদিসগুলো একত্র করলে দুটি বিষয় স্পষ্ট ফুটে উঠবে- ১. সুষম ও মধ্যম ধরন এবং ২. শরীরের প্রতিটি অঙ্গের সামঞ্জস্যপূর্ণতা। দৈর্ঘ্যে তিনি ছিলেন মাঝারি আকৃতির। বেশি লম্বা বা খাটো ছিলেন না। বর্ণের দিক থেকে ছিলেন স্বাভাবিক ফর্সা, ধবধবে সাদা বা তামাটে বর্ণের নয়, বরং উজ্জ্বল বর্ণের। তার মাথার চুল ছিল মধ্যম ধরনের, অর্থাৎ কোঁকড়ানোও না. একেবারে সোজাও না।

শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে যথাযথ সামঞ্জস্য থাকলেই দেহের সৌন্দর্য পূর্ণতা পায়, তিনি তেমনই ছিলেন। উভয় বাহুর মধ্যবর্তী স্থানের প্রশস্ততা, উভয় হাত ও পায়ের মাংসল হওয়া এগুলো কোনো দৈহিক ত্রুটি নয়। বরং তা সামঞ্জস্যেরই বিবরণ।

সোশ্যাল সাইটে শেয়ার করুন বন্ধুর সাথে...

Leave a Reply

Your e-mail address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2017-2018 Muftimahbub.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
ইসলামী জিজ্ঞাসা
 
জিজ্ঞাসা
 
ইসলামী জিজ্ঞাসা
+